কুরবানীর তাৎপর্য ও নেকী- আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): এই সংকটকালীন সময়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আরেকটি ঈদ হাজির। বছর পরিক্রমায় আবারও ঈদুল আযহা আমাদের সামনে সমাগত। ঈদুল আযহা অর্থ কুরবানীর খুশী। কুরবানীর দিনে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জানোয়ার জবাই করা হয় এবং এর মাধ্যমে সম্পদের ত্যাগ স্বীকার করা হয়। আর এই মালের কুরবানী দিতে পারার মধ্যে মু’মিনের এক ধরণের আনন্দ বোধ থাকে।

এর জন্যেই একে কুরবানীর ঈদ বলা হয়। ইসলামে অনেক রকমের কুরবানী তথা ত্যাগের বিধান রয়েছে। কিছু আছে জানের কুরবানী। যেমনঃ নামাজ, রোজা, হজ¦, জিহাদ ইত্যাদির বিধান। এগুলো পালন করতে জান-দেহকে কষ্ট দিতে হয়। কিছু আছে মালের কুরবানী। যেমনঃ যাকাত, ফেতরা, কুরবানী ইত্যাদির বিধান। এসব বিধান পালন করতে মালের কুরবানী দিতে হয়।

হজ¦ করতে জান এবং মাল উভয়েরই কুরবানী স্বীকার করতে হয়। আর এক ধরনের
কুরবানী হল মনের খাহেশ-চাহিদার কুরবানী। এই কুরবানী হল সবচেয়ে বড় কুরবানী। কারণ, মানুষের পক্ষে জান-মাল ব্যয় করা সহজ কিন্তু মনের ধ্যান-ধারণা, মনের চাহিদার কুরবানী দিয়ে আল্লাহর মানশা অনুযায়ী চলা কঠিন।

কুরবানীর প্রথা প্রথম মানব আদম (আঃ) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এদের কুরবানীর কাহিনী আল্লাহপাক কুরআনুল কারীমের সূরা মায়েদার ২৭-৩১আয়াতে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে আমাদের এই কুরবানীর সম্পর্ক হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র কুরবানীর অবিস্মরণীয় ঘটনার সাথে।

আর সে ঘটনার স্মরক হিসেবেই উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর কুরবানী ওয়াজিব করা হয়েছে। প্রায় সারা জীবন ইবরাহীম (আঃ) নিঃসন্তান ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে একদিন তিনি দুআ করলেন, “হে রব! আমাকে সৎপুত্র সন্তান দান কর” (সূরাঃ সাফফাত, আয়াত-১০০) আল্লাহ তার দুআ কবুল করলেন।

ইরশাদ হচ্ছে “অতঃপর আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম” (সূরাঃ সাফফাত, আয়াহ-১০১) এরপর আল্লাহপাক তাঁকে একটা পুত্র সন্তান দান করলেন, নাম ইসমাঈল, যখন পুত্রের বয়স ৭ অথবা ১৩ হল, তখন আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নের মাধ্যমে ইবরাহীম (আঃ) কে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের কুরবানীর হুকুম দিলেন।

ইরশাদ হয়েছে, “অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম তাকে বললেন, হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি। তুমি ভেবে দেখ, কী করবে? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ!

আপনি আমাকে সবরকারীদের মধ্যে পাবেন”। (সূরাঃ সাফফাত, আয়াত-১০২) রেওয়ায়েতে রয়েছে, পুত্র আরও বলল, পিতা! আমাকে খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি বেশি ছটফট করতে না পারি। কারণ, নড়াচড়া করলে আপনার যবাই করতে কষ্ট হবে। আপনার পরিধেয় বস্ত্রও শামলে নিন যাতে আমার রক্তের ছিটা তাতে না লাগে।

কেননা মা আমার রক্ত দেখলে অধিক ব্যাকুল হবেন। আর ছুরিটাও ভালভাবে ধারাল করে নিন এবং তা আমার গলায় দ্রæত চালাবেন, যাতে তাড়াতাড়ি যবাই সেরে ফেলতে পারেন সএবং আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার! আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম দিবেন। আমার জামা তাঁর কাছে পৌঁছাবেন।

এতে হয়ত তিনি সান্ত¡না খুঁজে পাবেন। এবার পিতা-পুত্র উভয়ে কুরবানীর জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হলেন। ইরশাদ হয়েছে, “যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে (ইসমাঈলকে) যবেহ করতে শায়িত করলেন”। (সূরাঃ সাফফাত, আয়াত-১০৩) এরপর তিনি স্বজোরে ছুরি চালালেন। এমতাবস্থায় জিবরাঈল (আঃ) বেহেশতী একটি দুম্বা নিয়ে উপস্থিত হলেন।

অবশেষে সেটিকেই কুরবানী করলেন ইবরাহীম (আঃ)। ইরশাদ হচ্ছে, “তখন
আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু”।(সূরাঃ সাফফাত, আয়াত-১০৪- ১০৭) কুরবানীর শিক্ষা হল, বান্দার জান-মাল সবকিছুই আল্লাহর হুকুমের সামনে সমর্পন করা।

ইরশাদ হচ্ছে, “আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ, সবাই রাব্বুল আলামীনের জন্য নিবেদিত”। (সূরাঃ আনআম, আয়াত-১৬২) হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কিরাম রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরবানীর তাৎপর্য কী?

রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত তথা আদর্শ। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের লাভ কী? তিনি বললেন, প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে। (ইবনে মাজাহ)। আল্লাহ আমাদের খালেছ নিয়তে কুরবানী করার তৌফিক দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here