আসুন জেনে নেয়া যাক ইসলামের দৃষ্টিতে রুপচর্চা কেমন হওয়া উচিত। প্রতিকী ছবি-সম্পাদিত

সুপ্রভাত বগুড়া (ফ্যাশন ও রুপচর্চা): রূপচর্চা, একটি অতি পরিচিত শব্দ। মানুষ নিজেকে অন্যের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে কিংবা কখনো আত্মতৃপ্তি লাভে নিজেকে সাজিয়েছে বিভিন্ন ভাবে। যা এক কথায় রূপচর্চাই বলা হয়। যুগ যুগ ধরে মানুষের সৌন্দর্যের একটা বিশাল অংশ বহন করে আসছে রূপচর্চা।

আর মানুষও একে লালন পালন করেছে যুগের পর যুগ। একটু পিছনে তাকালেই দেখা যায় অনেক ধাপ পেরিয়ে আজকের এই আধুনিক অবস্থানে এসেছে মানুষের জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য অংশটি।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো আজ থেকে ২০ হাজার বছর আগের ক্রো-ম্যানোরাই এই রূপচর্চা রীতির সর্বজন স্বীকৃত প্রবর্তক। তখন মানুষ নানান রঙে-বর্ণে-অলঙ্কারে নিজেকে সাজিয়ে কল্পিত দেবতাকে সন্তুষ্ট করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয় থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করতো। তার পর কেটে গেছে অনেককাল।

ধ্বংস হয়েছে নানা সভ্যতা। এসেছে নানা ধর্ম। রূপচর্চা ও ইসলাম একে অন্যের সাথে একসাথে জড়িত। এই সম্পর্ক ইসলাম প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই। ইসলাম ধর্মের ধর্মতাত্ত্বিক জায়গায় ত্বকের যত্ন একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ইসলাম সবসময় ত্বকের যত্ন চর্চায় জোর দিয়ে এসেছে।

বর্তমান চিকিৎসাবিদ্যায় ত্বকের যত্নের যেসব রূপরেখা দেখা হয়েছে তার সাথে ইসলাম ত্বকের যত্নে যেসব কৌশলের কথা বলেছে তা সম্পূর্ণভাবেই এক। ত্বক রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোদ এড়িয়ে চলা, যা মেসতা ও ব্রণ থেকে ত্বককে রক্ষা করে। এটা ইসলামে মেনে চলতে বলা হয়েছে দৃঢ়ভাবে।

সূর্যকিরণ পরিহার ও ইসলাম ত্বকের সুরক্ষায় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তার সাহাবীদের সরাসরি উপদেশ দিয়েছেন। সূর্যকিরণ এড়িয়ে চলা হচ্ছে ত্বক রক্ষার একটা উপায়। ময়লা ও জীবাণু থেকে ত্বককে নিরাপদ রাখতে হবে। হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তার সাহাবীদের বলেছেন দীর্ঘক্ষণ সূর্যকিরণ এড়িয়ে চলতে।

মহানবীর এক সাহাবী আবু দাউদ তার বই থেকে জানা যায়, ‘একবার আবু হাজিম রোদে বসেছিলেন। যার ফলে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তাকে ছায়ায় এসে বসাতে আদেশ করেন।’ যদিও স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সূর্যকিরণের উপকারিতা অনেক। তা সত্ত্বেও দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।

তার জন্য উপযুক্ত কাপড় পড়া জরুরি। বোরখা ও পাঞ্জাবির ব্যবহার এমনি এমনি আসে নি। এটা সূর্যের ক্ষতিকারক আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। এই রশ্মি ত্বক ক্যান্সারের কারণ।

ইসলামের সবেচেয়ে অপরিহার্য অংশ হচ্ছে পরিষ্কার থাকা। পরিষ্কার থাকা মানুষ অনেক রোগবালাই থেকে রক্ষা পায় আপনাআপনি। এর নির্দেশ স্বয়ং কোরানেই আছে। পবিত্র কোরান শরীফে বলা হয়েছে, ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।’

ত্বকের সুরক্ষা এবং ইসলাম ত্বকের রোগ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে চারিদিকে ছড়ায়। এই রোগ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মসজিদে কফ বা থুতু ফেলে, অন্য কারো গায়ে বা কাপড়ে লাগলে তার উচিত সেটা মুছে ফেলা।’

কফের জীবাণু থেকে বাতাসের মাধ্যমে অন্য যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। হতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, খুসখুসে কাশির মতো রোগ। শুধুমাত্র কি ধরণের রোগ হতে পারে সেটাই ইসলামে বলা হয়নি।

বরং এর প্রতিকার কিভাবে সম্ভব সেটারও স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে ইসলামে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক পরিবেশের যেসব উপাদানের কথা বলা হয়েছে সেটা ইসলাম বলেছে তার জন্মলগ্ন থেকেই। ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক সূর্যের আলোর কথা তখনি আলোচনায় ছিল।

ত্বকের যত্ন ও সুরক্ষায় যেসব বিষয় ইসলামে বলা হয়েছে আধুনিক যুগে এসে সেটা আরো শক্তিশালী হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, শুরু থেকেই ইসলাম ও ত্বকের যত্ন একে ওপরের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করেছে।

একটা গল্প শোনা যাক : মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে প্রসাধনের ব্যাপারটা অতীত ঐতিহ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলো। রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় এর বাঁধন ছেঁড়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সুগন্ধির প্রতি রানীর এতই দুর্বলতা ছিলো যে, পার্শ্বচরেরা সবসময় গায়ে গন্ধ মেখে ঘুরে বেড়াতো।

শোনা যায়, এলিজাবেথ এতই প্রসাধন ব্যবহার করেছিলেন যে, পরবর্তীতে তার ত্বকের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছিলো- শেষ জীবনে তিনি লজ্জায় কারো সামনে খুব একটা বেরোতেন না। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বের মানুষকে এই সমস্যায় হয়তো পড়তে হয় না! হয়তো-শব্দটা এই কারণেই বলা হলো যে, উত্তরআধুনিকতার এই যুগে এই জাতীয় সমস্যায় এখনও অনেক মানুষ পরে থাকে।

কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা একদমই ছিল না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে রূপচর্চা পর্যন্ত সবকিছু এখন বিজ্ঞানসম্মত ভাবে হয়ে থাকে। রূপচর্চা ও ত্বকের যত্নে পরীক্ষায় প্রমাণিত পণ্য ও ডিভাইসের দিকে এখন সবাই ঝুঁকছে। কারণ আগের চেয়ে নিজের যত্নে সবাই এখন অনেক সচেতন।

সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বায়োজিনও ত্বকের যত্নে সবচেয়ে আধুনিক ও ঝুঁকিহীন পথে হাঁটছে। বায়োজিনের পণ্যে যেমন কোনো ঝুঁকি নেই তেমনি ত্বকের চিকিৎসায় যেসব ডিভাইস ব্যবহার করা হয় সেগুলোতে নেই কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এইতো গেলো আধুনিক যুগ এবং বায়োজিনের বিষয়।

তবে এত কথার পর একটা কথা আসতেই পারে, ‘প্রাচীনকালে এলিজাবেথ, ক্লিওপেট্রার মতো বিখ্যাত নারীরা রূপচর্চা করতো। কই তারা তো আধুনিক রূপচর্চা পদ্ধতি মেনে চলতো না, আর তাদের সময় এইসব আধুনিক পণ্য ও ডিভাইস তো ছিল না।

তবুও তারা দেখতেও সুন্দর ছিল, সেটা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।’ আপনার এই কথা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই তখনকার সময়ের আবহাওয়া ও পরিবেশ এখনকার মতো এত রূঢ় ছিল না। আর তারা তখনকার সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতিতেই রূপচর্চাটা করতেন। বায়োজিনের কাজ হচ্ছে আপনার ত্বকের সুরক্ষা করা।

প্রাচীনকালে মানুষ সাধারণ একটা মাপকাঠি মেনে রূপচর্চা করতো। কিন্তু আধুনিক কালে এসে সেটার বিস্তার আরো বেড়েছে। আধুনিককালে ত্বক অনুযায়ী এবং ত্বকের জন্য প্রযোজ্য রূপচর্চা করা হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো এটা কি শুধুমাত্র আধুনিককালে এসেই শুরু হয়েছে। উত্তরটা হলো না।

ইসলামের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ত্বক সুরক্ষা ও যত্নে উপর্যুপরি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সূর্যকিরণ পরিহার, ত্বকের সুরক্ষায় ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনার কথা আগের পর্বে বলা হয়েছে। সূর্য রশ্মির কারণে ত্বকের সমস্যা, বায়ুবাহিত রোগ কেন হয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা আমরা জেনেছি ।

এখন ত্বকের সুরক্ষায় ইসলামের আরো কিছু দিকনির্দেশনার কথা জানবো :

ওযু:  ইসলামকে বলা হয় সবচেয়ে আধুনিক এবং পরিপূর্ণ ধর্ম। কথাটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কথাটার সাথে যে মাহাত্ম্য জড়িয়ে আছে সেটা হয়তো আমরা অনুধাবন করি না। ইসলামে সব বিষয়ের উপর একটা সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। ওযুর কথাই ধরা যাক। ওযু কিভাবে করতে হবে সেটা মেনেই আমরা ওযু করি। কইবার হাত, নাক, পায়ে পানি দিতে হবে তা আমরা সবাই জানি।

কিন্তু ওযুর সাথে যে আপনার ত্বক সুরক্ষার বিষয়টি জড়িয়ে আছে সেটা কি ভেবে দেখেছেন? ত্বক পরিচর্যা ও সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে নিজের ত্বক পরিষ্কার ও ধুলা-বালি মুক্ত রাখা। ওযু আপনার ত্বক সুরক্ষায় ঠিক এই কাজটি করে। দিনে পাঁচবার ওযু করলে আপনার ত্বক থাকবে পরিষ্কার এবং মুখ থাকবে সুস্থ। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় বাইরে যাওয়ার আগে পানি দিয়ে মুখ ধুঁয়ে নিলে ত্বকে দাগ পড়া, ব্রণ হওয়ার সম্ভবনা কমে যায়।

গোসল: ত্বকের সুরক্ষায় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামের একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে গোসলের। আবু হুরায়রার বর্ণনা থেকে জানা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সাত দিনে একবার গোসল করাকে বাধ্যতামূলক করেছেন।

গোসলের উপকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আরও শক্ত জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। আধুনিক সময়ের গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত গোসল করলে ত্বকের রোগ হওয়ার হার কমে এবং ত্বক ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পায় অনেকক্ষেত্রেই।

রূপচর্চার সাথে ত্বকের যত্নের একটা ভালো যোগসাজোস আছে। সেই সাথে আছে ইসলামের দিক নির্দেশনারও। ইসলামের দিক নির্দেশনা মেনে চললে যে কেউ বায়ুবাহিত রোগ এবং চর্ম সংক্রান্ত রোগ থেকে মুক্তি পাবেন সহজেই। বর্তমান যুগের সাথে সেটা পরিপূরক।

আর ত্বকের যত্নের সাথে সাথে প্রসাধন এবং স্কিন কেয়ার পণ্যের নামটা চলে আসে আপনাআপনি। প্রসাধনের ব্যাপারে ইউরোপে যেমন নব জাগরণ এনেছিলো ফ্রান্স। তেমনি ত্বকের যত্নে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে চললে আপনি আপনার ত্বকে আনতে পারেন নব জোয়ার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here