যাকাত আদায়ের গুরুত্ব ও হিকমত। প্রতিকী-ছবি

আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): ‘যাকাত’ মানে পবিত্রকরণ বা বৃদ্ধি। শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদের মধ্য হতে নির্দিষ্ট অংশ যাকাত পাবার হক্বদারদের মধ্যে কোনো উপকারের আশা করা ব্যতীত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিতরণ করাকে যাকাত বলে।

যাকাত ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। যাকাত মুমিন বান্দার আর্থিক ইবাদত, যা ইসলামি জীবন বিধানে একটি অন্যতম এবং মুসলিম উম্মাহর অর্থনীতির মেরুদন্ডবিশেষ। বুদ্ধিমান, প্রাপ্তবয়স্ক, ছাহেবে নেছাব মুসলমানের উপর বৎসরে একবার যাকাত আদায় করা ফরজ।

কুরআনের জায়গায় জায়গায় যাকাত আদায় করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিগণের গুণাবলী এভাবে বর্ণনা করেছেন, মুত্তাকি তারা যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ^াস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে সৎপথে ব্যয় করে। (সূরাঃ বাকারা, আয়াতঃ৩) যাকাত আদায় না করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের জন্য একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও যমিনের পরম সত্ত¡াধিকারী।

আর যা কিছু তোমরা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াতঃ১৮০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন, যারা সোনা-রুপা জমা করে রাখে, অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা ব্যয় করে না। আপনি তাদেরকে কঠোর শাস্তির সুসংবাদ দিন। সেদিন ঐ সমস্ত সম্পদগুলো জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পাঁজরে-পাশর্^দেশে এবং পৃষ্ঠে দাগ দেওয়া হবে এবং বলা হবে এখন এর স্বাদ গ্রহণ কর, যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে। (সূরাঃ তাওবা, আয়াতঃ৩৪-৩৫)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, যাকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দান করেছেন আর সে তার যাকাত প্রদান করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো মাথা সাপে রূপ দেওয়া হবে যার চক্ষুর উপর দু’টি কাল বিন্দু থাকবে। কিয়ামতের দিন তাকে তার গলায় বেড়ী স্বরূপ করা হবে।

অতঃপর সাপ তার মুখের দু’দিকে (কামড় দিয়ে) ধরবে আর বলবে আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সংরক্ষিত ধন। (বুখারী) অন্য হাদীসে আছে, কিয়ামতের দিন তোমাদের রক্ষিত সম্পদ কেশহীন সাপে রূপ দেওয়া হবে। সম্পদের মালিক সাপ থেকে পালিয়ে যেতে চাইবে কিন্তু সাপটি তাকে খুঁজে বের করে তার হস্তে দংশন করতে থাকবে। (মিশকাত) দারিদ্র্যবিমোচনে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। যাকাত ব্যবস্থা ধনী-গরীবের আকাশ-পাতাল বৈষম্য হ্রাস করে এবং হৃদ্যতা সৃষ্টি করে।

অভাবমুক্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠিত করে। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়ন করে। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা রক্ষা করে। মানুষকে ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। যাকাতদাতার আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হয় এবং মালের মধ্যে বরকত হয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটে। যাকাতের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর শুররিয়া আদায় হয়। আখেরাতে নাজাতের পথ উম্মোচন হয়। সর্বপরি আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন।

কিন্তু এই ব্যবস্থাটি উপেক্ষিত হওয়ায় আমরা এর কাঙ্খিত সুফল থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে যাকাত আদায় করে পরিকল্পিতভাবে দারিদ্র্যবিমোচনে এ অর্থ ব্যয় করলে ইনশাআল্লাহ এদেশ থেকে দারিদ্র্য অবশ্যই পালিয়ে যাবে। যাকাত বিধানের লক্ষ্য ও হিকমত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যাতে ধনৈশ^র্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়। (সূরাঃ হাশর, আয়াতঃ৭)

যাকাত আসলে সরকারী ভাবে আদায় ও বন্টনের কথা। কিন্তু তা না হওয়ায় জাতি যাকাতের সর্বব্যাপী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকছে। তবে ব্যক্তিগত ভাবে হলেও যাকাত অবশ্যই দিতে হবে। যাকাত আদায়ের জন্য সমূদয় সম্পদ হিসাব করে আনুপাতিক হারে যাকাত আদায় করতে হবে।

অন্যথায় এমনিতেই অধিক সম্পদ দান করলেও যাকাত আদায় হবে না। তাই যাকাত কাদের উপর ফরজ এবং কখন? যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ, কোন অর্থ-সম্পদের যাকাত আসে আর কোন গুলোয় আসে না, যাকাত পাওয়ার হক্বদার কে কে? কোন খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না ইত্যাদি মাসায়েল বিজ্ঞ আলেমদের থেকে জেনে নেওয়ার অনুরোধ করছি। কেননা এই সংক্ষিপ্ত কলামে এত দীর্ঘ আলোচনা সম্ভব নয়। অন্যান্য তাৎপর্য ও ফজীলতের অধিকারী মাহে রমজানে এবং এই দুর্যোগকালীন সময়ে যাকাতের অর্থ নিয়ে বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ালে আল্লাহ তায়ালা যেমন সন্তুষ্ট হবেন তেমনি নেকীও অনেক বেশী লাভ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here